Sunday, 19 July 2026

বন্যা নিয়ন্ত্রণ

প্রকৃতিকে প্রতিপক্ষ নয়, বরং সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত

প্রকাশিত :

ড. কবিরুল বাশার

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা দেখা দেয়। কখনো এটি কৃষিজমিতে উর্বর পলি এনে কৃষিকে সমৃদ্ধ করে, আবার কখনো মানুষের জীবন, ঘরবাড়ি, ফসল, সড়ক ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি করে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক পাহাড়ি ঢল এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ভবিষ্যতে বন্যার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। এতদিন বন্যা নিয়ন্ত্রণে বাঁধ, কংক্রিটের দেয়াল, স্লুইসগেট বা নদী খননের মতো প্রকৌশলভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর বেশি নির্ভর করা হয়েছে।

জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহের টানা ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে দেশের উত্তর, উত্তর-পূর্ব এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা আবারও বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। হাজার হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফসলের মাঠ, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জনজীবন।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অল্প সময়ে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত এবং আকস্মিক বন্যার ঘটনা বাংলাদেশে ক্রমেই বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় শুধু বাঁধ নির্মাণ, নদী শাসন বা কংক্রিটের অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে বন্যা মোকাবিলা করা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাই এখন গুরুত্ব পাচ্ছে প্রকৃতিনির্ভর সমাধান (Nature-based Solutions), যেখানে বন, নদী, জলাভূমি, প্লাবনভূমি ও ম্যানগ্রোভের মতো প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে বন্যার ঝুঁকি কমানো হয়।

প্রকৃতিকে প্রতিপক্ষ নয়, বরং অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করার এই ধারণাই ভবিষ্যতের টেকসই বন্যা ব্যবস্থাপনার অন্যতম ভিত্তি হতে পারে।

প্রকৃতিনির্ভর সমাধান বলতে এমন সব ব্যবস্থা বোঝায়, যেখানে প্রকৃতির নিজস্ব প্রক্রিয়া ও বাস্তুতন্ত্রকে কাজে লাগিয়ে মানুষের সমস্যার সমাধান করা হয়। বন্যার ক্ষেত্রে এর অর্থ হলো নদী, বন, জলাভূমি, হাওর, বিল, ম্যানগ্রোভ বন এবং প্রাকৃতিক প্লাবনভূমিকে এমনভাবে সংরক্ষণ বা পুনরুদ্ধার করা, যাতে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে ধারণ ও প্রবাহিত হতে পারে।

বনভূমি বন্যা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গাছের পাতা বৃষ্টির পানির গতি কমিয়ে দেয় এবং শিকড় মাটির ভেতরে পানি প্রবেশের সুযোগ তৈরি করে। ফলে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ পানি নদীতে নেমে এসে আকস্মিক বন্যা সৃষ্টি করতে পারে না।

পাহাড়ি এলাকায় নির্বিচারে বন উজাড় হলে মাটির ক্ষয় বাড়ে, নদীতে পলি জমে এবং নদীর পানি ধারণক্ষমতা কমে যায়। তাই পাহাড়ি বন সংরক্ষণ শুধু জীববৈচিত্র্যের জন্য নয়, বন্যা ব্যবস্থাপনায়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

জলাভূমি হলো প্রকৃতির তৈরি বিশাল স্পঞ্জের মতো। অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি জলাভূমিতে জমা থাকে এবং ধীরে ধীরে নদীতে ফিরে যায়। এতে বন্যার তীব্রতা কমে। কিন্তু নগরায়ণ ও অবৈধ দখলের কারণে দেশের অনেক খাল, বিল ও জলাভূমি হারিয়ে যাচ্ছে।

বিশেষ করে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোয় জলাধার ভরাটের ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। যদি এসব জলাভূমি সংরক্ষণ করা যায়, তাহলে নগর বন্যার ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

উপকূলীয় অঞ্চলে সুন্দরবনের মতো ম্যানগ্রোভ বন প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা প্রাচীর হিসেবে কাজ করে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় এই বন ঢেউয়ের শক্তি কমিয়ে উপকূলকে রক্ষা করে। একই সঙ্গে এটি মাছ, কাঁকড়া ও নানা বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং বিপুল পরিমাণ কার্বন শোষণ করে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায়ও ভূমিকা রাখে।

বিশ্বের অনেক দেশ ইতিমধ্যে প্রকৃতিনির্ভর বন্যা ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। নেদারল্যান্ডসের ‘রুম ফর দ্য রিভার’ কর্মসূচির আওতায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের জন্য অতিরিক্ত জায়গা তৈরি করা হয়েছে।

নদীর তীর উঁচু করার পরিবর্তে প্লাবনভূমি পুনরুদ্ধার, বাঁধ কিছুটা পিছিয়ে নেওয়া এবং অতিরিক্ত পানি ধারণের জন্য নতুন জলাধার তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে বন্যার ঝুঁকি কমার পাশাপাশি নদীর বাস্তুতন্ত্রও পুনরুজ্জীবিত হয়েছে।

চীনের ‘স্পঞ্জ সিটি’ উদ্যোগে শহরগুলো এমনভাবে পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যাতে বৃষ্টির পানি দ্রুত ড্রেনে ফেলে না দিয়ে পার্ক, জলাভূমি, ছাদবাগান, রেইন গার্ডেন এবং পানি শোষণক্ষম ফুটপাতের মাধ্যমে মাটিতে প্রবেশ করতে পারে। এতে নগর জলাবদ্ধতা কমছে, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ বাড়ছে এবং শহরের তাপমাত্রাও কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকছে।

ভিয়েতনামের মেকং বদ্বীপে ম্যানগ্রোভ বন পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে উপকূলীয় বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। একই সঙ্গে এসব বন মাছ ও চিংড়ির প্রাকৃতিক আবাসস্থল তৈরি করে স্থানীয় মানুষের জীবিকাও সমৃদ্ধ করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি নদী অববাহিকায় বিভিন্ন স্থানে প্রাকৃতিক জলাভূমি ও প্লাবনভূমি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে, যাতে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি সাময়িকভাবে ধারণ করা যায়। এতে নদীর নিম্নাঞ্চলে বন্যার চাপ কমেছে এবং জলচর প্রাণীর আবাসস্থলও পুনরুদ্ধার হয়েছে।

যুক্তরাজ্যে ‘ন্যাচারাল ফ্লাড ম্যানেজমেন্ট’ কর্মসূচির আওতায় নদীর উজানে গাছ লাগানো, ছোট ছোট জলাধার তৈরি, নদীর আঁকাবাঁকা স্বাভাবিক গতিপথ ফিরিয়ে আনা এবং কৃষিজমিতে পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে আকস্মিক বন্যার তীব্রতা কমেছে এবং মাটির ক্ষয়ও হ্রাস পেয়েছে।

জাপানে নদীর তীরবর্তী সবুজ বাফার অঞ্চল, জলাভূমি সংরক্ষণ এবং পাহাড়ি বন পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের প্রভাব কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে শহরগুলোয় পার্ক ও উন্মুক্ত সবুজ স্থান বৃদ্ধি করে বৃষ্টির পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে।

এই উদাহরণগুলো দেখায়, প্রকৃতিকে দমন করার পরিবর্তে তার স্বাভাবিক কার্যক্রমকে পুনরুদ্ধার ও শক্তিশালী করলে বন্যা নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর, অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক এবং পরিবেশবান্ধব হতে পারে।

বাংলাদেশেও প্রকৃতিনির্ভর সমাধানের সম্ভাবনা অনেক। নদী ও খালের স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা, জলাভূমি সংরক্ষণ, পাহাড়ি বন পুনরুদ্ধার, উপকূলে ম্যানগ্রোভ বনায়ন, শহরে পার্ক, ছাদবাগান, রেইন গার্ডেন ও পানি শোষণক্ষম উন্মুক্ত স্থান বৃদ্ধি করলে বন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে কৃষিজমিতে প্রাকৃতিক পানি ধারণের ব্যবস্থা এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বন্যাকে পুরোপুরি থামানো সম্ভব নয়, কারণ এটি একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। তবে সঠিক পরিকল্পনা ও প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বয় করে এর ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়। প্রকৃতিকে প্রতিপক্ষ নয়, বরং সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করাই ভবিষ্যতের টেকসই বন্যা ব্যবস্থাপনার মূল দর্শন।

জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে বাংলাদেশের জন্য প্রকৃতিনির্ভর সমাধান কোনো বিলাসিতা নয়; এটি একটি প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ। নদী, বন ও জলাভূমিকে রক্ষা করা মানে শুধু জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নয়, বরং মানুষের জীবন, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

প্রকৃতিকে রক্ষা করতে পারলেই প্রকৃতি আমাদের রক্ষা করবে, বন্যা মোকাবিলায় এই সত্য আজ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক।

ড. কবিরুল বাশার : অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
professorkabirul@gmail.com

 

 

সর্বশেষ

ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার: সেরা অভিনেতা-অভিনেত্রী যারা

ভারতের চলচ্চিত্রে সর্বোচ্চ সম্মাননা '৭২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০২৪' ঘোষণা করা হয়েছে। শনিবার (১৮...

‘দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো সবার নৈতিক দায়িত্ব’

চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কাঞ্চনা ইউনিয়নে সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মাঝে ত্রাণ ও আর্থিক সহায়তা...

মীর হেলালের পক্ষ থেকে নাঙ্গলমোড়ায় বন্যাদুর্গত মানুষের মাঝে ৪র্থ দফায় ত্রাণ বিতরণ

চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার নাঙ্গলমোড়া ইউনিয়নে টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত...

জনগণই দেশের মালিক, প্রধানমন্ত্রীর ব্রত বৈষম্যহীন মর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়া: মীর হেলাল

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূর করে সকলের জন্য...

আরও পড়ুন

জনগণই দেশের মালিক, প্রধানমন্ত্রীর ব্রত বৈষম্যহীন মর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়া: মীর হেলাল

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের দারিদ্র্য ও বৈষম্য দূর করে সকলের জন্য...

আওয়ামী লীগ জন্মলগ্ন থেকে দেশের ক্ষতি করেছে: বিদ্যুৎমন্ত্রী

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, ‘সোনালী আঁশ দেশের পাট...

হ্যারি কেইনদের বিপক্ষেও ইতিহাস গড়ার সুযোগ এমবাপ্পেদের

বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে নিউ জার্সিতে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড। সেমিফাইনালে পরাজিত এই দুই...