সরবরাহকারীদের দাবি—‘সফটওয়্যারের ওপর ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ নয়, রেলওয়ের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হোক’
চট্টগ্রাম: বাংলাদেশ রেলওয়ের সরঞ্জাম বিভাগের ইনভেন্টরি, প্রকিউরমেন্ট ও সাপ্লাই ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো Bangladesh Railway Automated Support System (BRASS)। রেলওয়ের বিপুল পরিমাণ যন্ত্রাংশ, মালামাল, মজুদ, চাহিদা, ক্রয় ও সরবরাহ কার্যক্রম ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত এই সফটওয়্যারকে ঘিরে এবার উঠেছে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনব্যবস্থা নিয়ে নানা প্রশ্ন।
বাংলাদেশ রেলওয়ের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, BRASS-I-এ ডিজেল লোকোমোটিভের খুচরা যন্ত্রাংশ, কম্পোনেন্ট ও অ্যাসেম্বলির ইনভেন্টরি, প্রকিউরমেন্ট ও সাপ্লাই ব্যবস্থাপনা করা হয়। অন্যদিকে BRASS-II-এর মাধ্যমে বিভিন্ন বিভাগের নন-ডিজেল আইটেম এবং দৈনন্দিন পরিচালনার প্রয়োজনীয় মজুদী ও অমজুদী সামগ্রীর ইনভেন্টরি, প্রকিউরমেন্ট ও সাপ্লাই ব্যবস্থাপনা করা হয়।
রেলওয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনায় BRASS-I ও BRASS-II-এর মাধ্যমে অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি চাহিদা, অনুমোদন, পারচেজ ইন্ডেন্টসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াও ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে। ২০২২ সালের রেলওয়ের তথ্যেও BRASS-I ও BRASS-II-কে ইনভেন্টরি ব্যবস্থাপনা অটোমেশনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সফটওয়্যার পরিচালনায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট সূত্র ও সরবরাহকারীদের অভিযোগ, BRASS সফটওয়্যারটির কারিগরি উন্নয়ন ও সহায়তার সঙ্গে Corporate IT Limited (CITL)-এর সম্পৃক্ততা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্যসূত্রেও বাংলাদেশ রেলওয়ের BRASS প্রকল্পে তাদের সম্পৃক্ততার উল্লেখ পাওয়া যায়। একটি প্রযুক্তি-সংশ্লিষ্ট প্রোফাইলে BRASS-কে বাংলাদেশ রেলওয়ের procurement ও material management software হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং BRASS-II-কে নন-ডিজেল সামগ্রীর ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
এ ছাড়া BASIS-এর একটি প্রকাশনায় Corporate IT Limited-এর বাংলাদেশ রেলওয়েকে ক্লায়েন্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল এবং প্রতিষ্ঠানটির সেবা ও পণ্যের মধ্যে বৃহৎ পরিসরের Enterprise Inventory and Material Management Systems-এর কথাও বলা হয়েছে।
তবে সফটওয়্যারটির মালিকানা, সার্ভার অ্যাক্সেস, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, সোর্স কোড, ডেটাবেজ এবং কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণের প্রকৃত এখতিয়ার কার—এ বিষয়ে রেলওয়ের প্রকাশ্য নথিতে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে এ বিষয়টি পরিষ্কার করতে সংশ্লিষ্ট চুক্তি, টেন্ডার নথি, সার্ভিস লেভেল এগ্রিমেন্ট (SLA), সোর্স কোড/ডেটাবেজ ব্যবস্থাপনা এবং অ্যাক্সেস কন্ট্রোল নীতিমালা প্রকাশের দাবি উঠেছে।
‘ইচ্ছামতো সিস্টেম ধীর বা বন্ধ’—সরবরাহকারীদের অভিযোগ
সরঞ্জাম বিভাগের তালিকাভুক্ত কয়েকজন সরবরাহকারী অভিযোগ করেছেন, BRASS ব্যবস্থাপনায় CITL-এর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে। তাদের অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার হিসেবে পরিচিত জিল্লুর রহমান লিপটন।
সরবরাহকারীদের দাবি, BRASS-এর কার্যক্রম কখনো স্বাভাবিক গতিতে চলে, আবার কখনো সিস্টেম ধীরগতির হয়ে যায় কিংবা ব্যবহারকারীদের লগইনসংক্রান্ত জটিলতা দেখা দেয়। তাদের অভিযোগ, বিশেষ করে সরঞ্জাম বিভাগে বাজেট বা বড় ধরনের ক্রয় কার্যক্রম শুরু হওয়ার সময় এ ধরনের সমস্যার কারণে চাহিদা, ইন্ডেন্ট, অনুমোদন ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে ইনভেন্টরি কন্ট্রোল(সিআরবি) দপ্তরের সফটওয়্যার সম্পূর্ণ রূপে বন্ধ রয়েছে। এছাড়া জেলা সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক(পরিদর্শন) দপ্তরের সফটওয়্যার আংশিক চালু রয়েছে। আরনোট এর অনলাইন কপি বের করা যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে পরিচালক ইনভেন্টরি কন্ট্রোল প্রকৌশলী সাজ্জাদুল ইসলাম বলেন…….
জেলা সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক(পরিদর্শন) প্রকৌশলী এস, এম, আল মুহিদ বলেন,…..
কর্মকর্তাদের ওপরও কি সফটওয়্যার নির্ভরতা তৈরি হয়েছে?
সরবরাহকারীদের আরও অভিযোগ, BRASS-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার পরিচালনায় রেলওয়ের নিজস্ব কারিগরি সক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ পর্যাপ্ত নয়। ফলে কোনো কারিগরি সমস্যার সমাধান, ব্যবহারকারীর অ্যাক্সেস, সফটওয়্যারের গতি কিংবা কোনো মডিউলের কার্যকারিতা নিয়ে সমস্যা দেখা দিলে বাইরের কারিগরি সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়।
কয়েকজন সরবরাহকারীর ভাষ্য, এর ফলে রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও অনেক ক্ষেত্রে সফটওয়্যার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের কারিগরি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে হয়। তারা আরও অভিযোগ করেছেন, রেলওয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সফটওয়্যার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আচরণ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
জিল্লুর রহমান অতিরিক্ত প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক প্রকৌশলী আনোয়ারুল ইসলাম ব্যতীত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ বা ধমক দেওয়ার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন সরবরাহকারী। জিল্লুর সাথে আনোয়ারুল ইসলামের সখ্যতার বিষয়টি সবার মুখে মুখে। জিল্লুর বিষয়ে আনোয়ারুল ইসলাম সব সময় মাথা ঘামান বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের মধ্যে পার্টনারশিপ রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
‘রেলের সফটওয়্যার, নিয়ন্ত্রণও রেলের হাতে থাকতে হবে’
সরবরাহকারীদের মূল দাবি, বাংলাদেশ রেলওয়ের অর্থে তৈরি ও রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও ক্রয় কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত কোনো সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনায় এমন পরিস্থিতি থাকা উচিত নয়, যেখানে একজন ব্যক্তি বা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি হয়।
তাদের মতে, BRASS-এর সার্ভার, ডেটাবেজ, ইউজার অ্যাক্সেস, অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কন্ট্রোল, ব্যাকআপ, সাইবার নিরাপত্তা এবং সফটওয়্যার ব্যবস্থাপনার মূল নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশ রেলওয়ের নিজস্ব কাঠামোর মধ্যে থাকা প্রয়োজন।
একজন সরবরাহকারী বলেন, “সফটওয়্যারটি যদি রেলওয়ের কার্যক্রমের জন্য অপরিহার্য হয়, তাহলে এর নিয়ন্ত্রণও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রেলওয়ের হাতে থাকা উচিত। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হলে সেটি দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ।”
আরেক সরবরাহকারীর ভাষ্য, “BRASS বন্ধ বা ধীরগতির হলে শুধু একজন ঠিকাদার বা সরবরাহকারী ক্ষতিগ্রস্ত হন না; এর প্রভাব পড়তে পারে চাহিদা, ক্রয়, সরবরাহ ও রেলওয়ের বিভিন্ন বিভাগের দৈনন্দিন কার্যক্রমে।”
BRASS-এর ওপর নির্ভরতা কতটা?
বাংলাদেশ রেলওয়ের নিজস্ব তথ্যেই BRASS-এর কার্যক্রমের ব্যাপ্তি স্পষ্ট। রেলওয়ের ইনভেন্টরি ব্যবস্থাপনায় ডিজেল ও নন-ডিজেল—দুই ধরনের সামগ্রীর তথ্য, মজুদ, প্রকিউরমেন্ট ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় BRASS-I ও BRASS-II ব্যবহৃত হচ্ছে।
রেলওয়ের ২০২২ সালের তথ্যপুস্তিকায় বলা হয়েছে, রেলওয়ের বিপুল সংখ্যক ডিজেল স্পেয়ার, ক্যারেজ, ওয়াগন ও অন্যান্য সামগ্রী ব্যবস্থাপনার জন্য Inventory Control Cell-এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে কম্পিউটারভিত্তিক ইনভেন্টরি ব্যবস্থাপনা চালু রয়েছে এবং পরবর্তীতে স্টোরস ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ক্ষেত্রকে ডিজিটাল ও অটোমেটেড করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ BRASS কোনো সাধারণ অফিস সফটওয়্যার নয়; এটি রেলওয়ের সরঞ্জাম ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ অপারেশনাল অবকাঠামোর অংশ।
বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে যে প্রশ্নগুলো সামনে আসছে
সরবরাহকারীদের অভিযোগের পাশাপাশি বিষয়টি নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক প্রশ্নও সামনে এসেছে—
১. BRASS-I ও BRASS-II-এর পূর্ণাঙ্গ মালিকানা কার?
২. সফটওয়্যারের সোর্স কোড ও ডেটাবেজের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?
৩. সিস্টেম অ্যাডমিন ও ইউজার অ্যাক্সেস প্রদানের চূড়ান্ত ক্ষমতা কার?
৪. কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সিস্টেম বন্ধ, ধীর বা ব্যবহারকারীর অ্যাক্সেস সীমিত করার সুযোগ আছে কি না?
৫. BRASS-এর দৈনিক/মাসিক আপটাইম ও ডাউনটাইমের কোনো সরকারি অডিট রিপোর্ট রয়েছে কি না?
৬. সফটওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য রেলওয়ে ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কী ধরনের চুক্তি রয়েছে?
৭. চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে সফটওয়্যার ও ডেটার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রেলওয়ের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা আছে কি না?
৮. রেলওয়ের নিজস্ব আইটি টিমকে সফটওয়্যার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে কি না?
৯. BRASS-এর সার্ভার, ব্যাকআপ ও Disaster Recovery ব্যবস্থার ওপর রেলওয়ের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ কতটুকু?
১০. গুরুত্বপূর্ণ সরকারি সফটওয়্যারের ওপর কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা রয়েছে কি না—তা নিয়ে স্বাধীন কারিগরি অডিট করা হয়েছে কি না?
প্রয়োজন স্বাধীন কারিগরি ও প্রশাসনিক অডিট
সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হচ্ছে স্বাধীন কারিগরি অডিট। অডিটে BRASS-এর সার্ভার অ্যাক্সেস, লগইন লগ, সিস্টেম আপটাইম, ডাউনটাইম, অ্যাডমিন কার্যক্রম, ডেটাবেজ পরিবর্তনের ইতিহাস, ব্যাকআপ ব্যবস্থা এবং সফটওয়্যার রক্ষণাবেক্ষণের চুক্তি পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ অডিট বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সফটওয়্যার পরিচালনার প্রশাসনিক কাঠামোও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সরবরাহকারীরা।
তাদের দাবি, BRASS-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি।
রেলওয়ের বক্তব্য কী?
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে BRASS-এর কারিগরি নিয়ন্ত্রণ, CITL-এর সঙ্গে চুক্তির ধরন, সফটওয়্যারের মালিকানা, সার্ভার ও ডেটাবেজ ব্যবস্থাপনা এবং সিস্টেম ডাউন/স্লো হওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলেন, এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া প্রয়োজন।
Corporate IT Limited এর জিল্লুর রহমান বলেন, আমি নিয়মিত বিল পাই না, কর্মচারীদের খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হয়। মাঝে মাঝে সফটওয়্যার বন্ধ রাখার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন
সবশেষে, BRASS-এর মতো রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামোর ক্ষেত্রে প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর সরকারি সম্পদের নিরাপত্তা, সফটওয়্যার মালিকানা, ডেটার নিয়ন্ত্রণ, সাইবার নিরাপত্তা, জবাবদিহি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার বিষয় হিসেবে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট সরবরাহকারীরা।
